পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি, ক্ষুব্ধ হয়ে সৎমাকে হত্যা

9 / 100

রাজধানীর কাফরুলে ব্যবসায়ী শাহজাহান শিকদার তার পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন তিনি। স্ত্রীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে দ্বিতীয় বিয়ের বউভাত অনুষ্ঠান করেন শাহজাহান। এতে তার প্রথম স্ত্রীর ছেলে এস এম আশিকুর রহমান নাহিদ ক্ষুব্ধ হন। বিয়ের পর সৎমা সীমা বেগমের কারণে পিতা শাহজাহানের সঙ্গে নাহিদের সম্পর্কেরও দূরত্ব বাড়ে। আর সীমা বেগম বিভিন্ন বিষয়ে নাহিদকে তিরস্কার করতেন। যার কারণে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সৎমা সীমার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে নাহিদ সবজি কাটার ধারালো ছুরি দিয়ে গলা ও ডান হাতের রগ কেটে হত্যা তাকে করেন। সীমা বেগম হত্যার ঘটনায় আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে এসব উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১১ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক টি এম ফরিদুর আলম আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আসামি আশিকুর রহমান নাহিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড আইনের ৩০২/২০১ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণ হওয়ায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় এ মামলার দায় থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন- জাকিয়া সুলতানা আইরিন, আসেক উল্লা, রোকেয়া বেগম, শাহজাহান শিকদার ও সাকিব।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক টি এম ফরিদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সৎমা সীমা বেগমকে ঘিরে পারিবারিক অশান্তি শুরু হয়। বিভিন্ন সময় আশিকুর রহমান নাহিদকে নিয়ে তিরস্কার করতেন সীমা বেগম। একপর্যায়ে সীমা বেগম নাহিদের মৃত মাকে নিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। এতে সে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে সীমা বেগমকে হত্যা করে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে সীমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ মামলার তদন্তে প্রাথমিকভাবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় শুধু আসামি নাহিদকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ’

মামলার অভিযোগপত্রে যা বলা হয়

আসামি শাহজাহান শিকদারের বাড়ি ফরিদপুর। তিনি ঢাকায় এসে কার্টন ফ্যাক্টরির ব্যবসা শুরু করেন। এ মামলার আসামি এস এম আশিকুর রহমান নাহিদ তার প্রথম পক্ষের ছেলে। ২০১৯ সালের ১২ জুলাই বিয়ের পর আশিকুর মিরপুরে শাহজাহান শিকদারের ফ্ল্যাটের উত্তর দিকে বসবাস শুরু করেন। অন্যদিকে একই ফ্ল্যাটের দক্ষিণ পাশে শাহজাহান তার বউকে নিয়ে বাস করেন। আশিকুরের বিয়ের আগে শাহজাহানের প্রথম স্ত্রী নাসিমা মারা যান। সেই মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না এমন ধারণায় নাহিদ তার মায়ের মৃত্যুর জন্য পিতা শাহজাহানকে দায়ী মনে করতেন।

মৃত্যুবার্ষিকীতে বউভাতের অনুষ্ঠান

নাহিদের মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অনুষ্ঠানের আগেই শাহজাহান শিকদার গ্রামের বাড়িতে যান। ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি শাহজাহান শিকদার তার ছেলে নাহিদকে ফোন দিয়ে জানান, তিনি গ্রামে দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছেন। একই বছরের ২৮ জানুয়ারি মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য নাহিদ রহমান তার স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যান এবং গিয়ে দেখেন তার পিতা শাহাজান বিয়ে করেছেন। এরপর নাহিদের মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে শাহজাহান তার দ্বিতীয় বিয়ে উপলক্ষে বউভাত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে নাহিদ তার পিতা শাহজাহানের ওপর ক্ষুব্ধ হন।

মাজারের সামনে ভিক্ষা করতে বলেন সৎমা

২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বউভাত ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে সবাই ঢাকার বাসায় ফিরে আসেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাসায় নিয়ে এলে শাহজাহানের আচার-আচরণ ও চিন্তাভাবনার পরিবর্তন হলে তার ছেলে নাহিদের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বেড়ে যায়। নাহিদের সৎমা তার সঙ্গে খারাপ আচরণ কর‍তে থাকেন এবং নাহিদের পিতার মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন খরচের ওপর হস্তক্ষেপ করতে থাকেন। নাহিদকে বাসা থেকে অন্যত্র গিয়ে টাকা উপার্জন করে খাওয়ার জন্য তার সৎমা বলতেন। নাহিদ তীব্র ক্ষোভ নিয়ে দিনাতিপাত করতেন। এর ধারাবাহিকতায় পড়াশোনার জন্য টাকা চাইলে পিতা শাহজাহানের সামনে সৎমা সীমা বেগম তাকে তিরস্কার করেন এবং মাজারের সামনে থালা নিয়ে বসে ভিক্ষা কর‍তে বলেন।

ক্ষুব্ধ হয়ে সবজি কাটার ছুরি দিয়ে হত্যা

সৎমা সীমা আসামি নাহিদ ও তার স্ত্রীকে নিয়ে গালাগাল করেন, কোনো টাকা-পয়সা দেবে না এবং তাদেরকে বাসা থেকে চলে যেতে বলেন। নাহিদের ধারণা, তার সৎমায়ের কারণে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নাহিদ তার সৎমায়ের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। এরপর ক্ষুব্ধ নাহিদ বাসার অন্য সবার অনুপস্থিতিতে তার সৎমা সীমা বেগমের ঘরে যান এবং তাদের সঙ্গে কেন খারাপ ব্যবহার করছে সেটা জানতে চান। এ সময় তাদের মধ্যে উত্তেজিত বাক্যবিনিময় হয় এবং ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। নাহিদের মৃত মাকে নিয়ে অনেক খারাপ কটূক্তি করেন সীমা বেগম। সৎমায়ের ধাক্কায় আঘাত পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে নাহিদ দৌড়ে গিয়ে রান্না ঘর থেকে ফল কাটার ধারালো ছুরি নিয়ে আসে। এরপর গলা ও ডান হাতের রগ কেটে সৎমা সীমা বেগমকে হত্যা করে। হত্যার চিহ্ন মুছে দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে সৎমা সীমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে সীমার শরীরের আংশিক অংশ পুড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। এ সময় নাহিদ ঘরের দরজা বন্ধ করে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যায়।

সীমা বেগম হত্যার ঘটনায় ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর তার বড় ভাই শরীফ মোহাম্মদ বাদী হয়ে কাফরুল থানায় মামলা দায়ের করেন। নিহত সীমার বাড়ি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায়। তার স্বামীর নাম শাজাহান সিকদার। এটি সীমার দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। ঘটনার তিন-চার মাস আগে শাজাহান সিকদারের সঙ্গে সীমার বিয়ে হয়।

কাফরুল থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক ইউসুফ হোসেন বলেন, ‘সৎমাকে হত্যার ঘটনায় আসামি আশিকুর রহমান নাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এ ছাড়া এ মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির আবেদন করা হয়েছে। এ মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে দিন ধার্য আছে। ‘

মামলার বাদী ও সীমার বড় ভাই শরীফ মোহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এজাহারভুক্ত সবাই জড়িত ছিল। হত্যাকাণ্ডের সময় তারা সবাই উপস্থিত ছিল। আসামিরা খুব প্রভাবশালী মানুষ। এ জন্য পাঁচজনকে বাদ দিয়ে শুধু একজন আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তদন্তে মূল ঘটনা উঠে আসেনি। পুনরায় তদন্তের জন্য চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি দেব। আমি এ হত্যার বিচার চাই। ‘

Leave a Comment