‘মৃত্যুকূপ’ থেকে ফিরে পেশা বদলেছেন আয়নাল-আমেনা

আয়নাল হকের বাঁ হাতটা অনেকটা অকেজো। ৯ বছর আগে পাঁজরের পাঁচটি হাড় ভেঙে গিয়েছিল। মেরুদণ্ডের ব্যথা এখনো দুঃসহ যন্ত্রণা দেয়। শরীরের ক্ষত স্পষ্ট।

শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েই রিকশা চালান তিনি। টানা চালাতে পারেন না। তবু জীবনের তাগিদে এই কাজ করতে হয়।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানার মনহরপুর গ্রামের আয়নাল হক ২০০৪ সালে ঢাকার সাভারে আসেন কাজের সন্ধানে। স্ত্রী ও ১১ বছরের ছেলে শরীফুলকে নিয়ে ছিল তাঁর সাজানো সংসার। কিন্তু ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ধস তাঁর সব কেড়ে নিয়েছে। রানা প্লাজার সপ্তম তলায় নিউ ওয়ে স্টাইল নামের একটি কারখানায় আয়রনম্যান হিসেবে কাজ করতেন। স্ত্রীও সেই কারখানায় অষ্টম তলায় চাকরি করতেন। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। আরো অনেকের সঙ্গে ভবনে চাপা পড়েন আয়নাল। এর তিন দিন পর হাসপাতালে তাঁর জ্ঞান ফেরে। তবে স্ত্রী অক্ষত ছিলেন। এরপর আস্তে আস্তে শুরু হয় তাঁর বেঁচে থাকার লড়াই।

আয়নাল হক বলেন, ‘ঘটনার পর ধারদেনা করে রিকশা কিনি। অসুস্থ শরীরে বেশিক্ষণ চালাতে পারি না। কোনোমতে সাভারে ব্যাংক কলোনিতে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছি। ছেলে এসএসসি পাসের পর অভাবের কারণে পড়ালেখা করতে পারছে না। মোবাইলের দোকানে কাজ শিখছে। সরকারের সহযোগিতা পেলে একটু ঘুরে দাঁড়াতে পারব। ’

আজ ২৪ এপ্রিল সাভার রানা প্লাজা ভবনধসের ৯ বছর। সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রানা প্লাজা ধসের বিভীষিকাময় সেই স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে পাথরের তৈরি দুই হাতের ম্যুরাল নিয়ে একটি শহীদ বেদি। এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা কাঁচি, আরেক হাতে হাতুড়ি। আর সেই জায়গায় কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে সুবজ ঘাস আর কচুগাছের আড়ালে ঢাকা পড়েছে রানা প্লাজার দুঃসহ স্মৃতি। প্রতিবছর দিনটি স্মরণ করতে মোমবাতি প্রজ্বালনসহ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে হতাহতদের পরিবার। বর্তমানে রানা প্লাজার জায়গাটি আদালতের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

আয়নাল হকের মতো রানা প্লাজায় আহত অন্য শ্রমিকরা শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী কর্মমুখী জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। তবে চিকিৎসা ব্যয় ও অর্থসংকটই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। সহযোগিতা ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে টাকা পেয়েছেন, তা চিকিৎসা ও সঠিক পরামর্শের অভাবে শেষ হয়ে গেছে। সরকারের সহযোগিতায় আহত শ্রমিক পুনর্বাসনের দাবি দীর্ঘদিনের। তবে কোনো সুরাহা হয়নি। তার ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে পড়েছে করোনার দুটি বছর। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা আরো পিছিয়ে গেছে।

সাভারে একটি ছোট দোকান করেছেন ভোলার চরফ্যাশনের আমেনা বেগম। রানা প্লাজার ভবনধসে তিনি ডান পা ও মেরুদণ্ডে আঘাত পান। স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন না। দোকানে কখনো দাঁড়িয়ে থাকেন, কখনো বসে থাকেন। তিনি বলেন, ‘কোনো কাজ করতে পারি না। স্বল্প পুঁজি নিয়ে দোকান করেছি। কোনোমতে জীবন কাটে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, পুনর্বাসনের মাধ্যমে আমাদের কর্মমুখী জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। ’

আহত আসাদুল শেখ বলেন, ‘শরীরের অক্ষমতা নিয়ে তেমন কোনো কাজ করতে পারি না। স্ত্রী চাকরি করত, তাই দিয়ে কোনোমতে চলত। এখন স্ত্রীও অসুস্থ। কী করব, কিভাবে চলব!’ সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের জরিপে দেখা যায়, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের ৫৬.৫ শতাংশের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে, যা গত বছর ছিল ১৪ শতাংশ। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেঁচে যাওয়া ২০০ জনের মধ্যে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জরিপে বলা হয়, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৫৩ শতাংশ এবং ৪৭ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থানে নিযুক্ত রয়েছেন। আহত শ্রমিকদের মধ্যে ঘন ঘন কাজ পরিবর্তন করার প্রবণতা দেখা গেছে, যার কারণ হিসেবে শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য দীর্ঘ সময় একই ধরনের কাজ করার অক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

শ্রমিক নেতা খায়রুল আলম মিন্টু বলেন, রানা প্লাজার ভবনধসের পর সরকারি-বেসরকারি অনেক সংস্থা আহত শ্রমিকদের সহযোগিতার মাধ্যমে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছিল। সরকার চাইলে আহত অসহায় শ্রমিকদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে কর্মমুখী করে তুলতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র, বিজিএমইএ ও মালিকপক্ষের প্রত্যেক শ্রমিকের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। প্রত্যক শ্রমিককে কাজে লাগানো সম্ভব। শ্রমিকদের যে আতঙ্ক বা অনাস্থা, তা দেশের অর্থনীতির জন্য খারাপ।

সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে রানা প্লাজার জমিটা আমরা তত্ত্বাবধান বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছি। রাষ্ট্রের অনুকূলে জমিটা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এসি ল্যান্ডকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment