‘মাগো কদিন পর বেতন পাইলে বাড়িত আমু’

10 / 100

‘গতকাল সকালেও ফোনে কথা কইছি হাবিবের সঙ্গে। হাবিব জিগাইছে, মাগো কী খাইছো? আমি কইছি, বাবা আমি নাস্তা করছি। নাস্তা কইরা মাইয়ারে পড়াইতে লইছি। তহন হাবিব কইলো, ওরে মাইরো না মা, ওরে আমি ডাক্তারি পড়ামু। ওর জন্য একটু কষ্ট করো, তোমাকে ওরে নিয়া চিন্তা করা লাগবে না। মাগো কদিন পর বেতন পাইলে বাড়িত আমু, ৪ দিনের ছুটি দিছে। ২ দিন আইতে-যাইতে, আর ২ দিন তোমাগো লগে থাকমু।’

আহাজারি করে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডে নিহত কম্পিউটার অপারেটর হাবিবুর রহমানের (২৫) মা হোসনে আরা বেগম।

নিহত হাবিবুর রহমান ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়ন দুই নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ বালিয়া বটতলা গ্রামের হরাজি বাড়ির মো. সিদ্দিক বেপারির মেয়ের ঘরের নাতি। হাবিবুরের বাবা শাহাবুদ্দিন পটুয়াখালীর বাসিন্দা। ছোট বেলায় বাবার মৃত্যু পর মায়ের সঙ্গে থাকতেন ভোলার দক্ষিণ বালিয়া গ্রামের নানা বাড়িতে।

দীর্ঘ সাত বছর আগে মামা আলমগীরের সঙ্গে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। চাকরি হয় সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। প্রতিদিনের মতো শনিবার (৪ জুন) রাতেও ডিপোতে নাইট ডিউটি পালন করছিলেন হাবিবুর রহমান। ওই রাতেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্য সবার সঙ্গে প্রাণ যায় হাবিবুরের। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। তার মৃত্যুতে কঠিন বাস্তবতার মুখে এখন পরিবার।

হোসনে আরা বেগম আরও বলেন, আমার বাবায় প্রতিদিন দুই-তিনবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা কইত। বাবায় এক সপ্তাহ দিনে ডিউটি করত, এক সপ্তাহ রাইতে। সাত মাস আগে আমার বনাই (বোনের জামাই) মারা যাওয়ার সময় হাবিবুর বাড়িতে আইছিল। এই ঈদে বাড়ি আসার কথা ছিল, কিন্তু ছুটি পায় নাই। হাবিবুরই আমাদের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল। আল্লাহ ওরে নিয়া গেল, এখন আমাদের কী হবে?

হাবিবুরের নানা মো. সিদ্দিক বেপারি বলেন, হাবিব ছোট থাকতেই তার বাবা মারা গেছে। আমরা ছোটবেলা থেকেই লালন-পালন করছি। এই সাত বছর হইছে সীতাকুণ্ডে বিএম ডিপোতে কাজ করে। গতকাল মাগরিবের সময় হাবিবুরের সঙ্গে কথা হইছে। তখন সে বলল, নানা আমার রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ডিউটি, এই সময় ফোন দিয়েন না। কথা বলার পরে আর কিছু জানি না।

আজ সকালে খবর পেয়ে আমার ছেলেরে ফোন দিলে সে জানায়, গতকাল রাতে ডিপুতে কেমিক্যাল বিস্ফোরণ হয়েছে, তাতে অনেক মানুষ মারা গেছে। তখন হাবিবুরের কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, হাবিবুরও মারা গেছে। আমরা হাবিবুরের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছি। এই হাবিবুর আমার স্বামী মরা মেয়ে ও বাপ মরা নাতিনের মুখে খাবার যোগাতো। এখন আমার মেয়ে ও নাতিনেরে কে দেখব?

হাবিবুরের মামা মো. আলমগীর মোবাইল ফোনে ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুপুর ৩টায় চট্টগ্রাম মেডিকেলের মর্গ থেকে হাবিবুরের ময়নাতদন্ত শেষে আমাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছে। আমি ও হাবিবুরের বন্ধুরাসহ মরদেহ নিয়ে ভোলার উদ্দেশ্য রওয়ানা দিয়েছি। রাতের মধ্যে ভোলায় পৌঁছাতে পারব। হাবিবুরের মরদেহ অগ্নিকান্ডে দগ্ধ থাকায় বাড়িতে কবর খুঁড়ে রাখার কথা বলা হয়েছে। জানাজা নামাজের সময় নির্ধারণ করা হয়নি। যত দ্রুত হাবিবুরের লাশ নিয়ে বাড়ি পৌঁছাতে পারব, ততো দ্রুত তাকে দাফন করা হবে।

এদিকে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইফতারুল হাসান (স্বপন) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডে নিহত হাবিবুরের পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে হাবিবুরের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন।

Leave a Comment