তাহলে আমরা পারিটা কী

 

আমাদের দেশে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক অনেকটা বিয়েবাড়ির কনের মতো! তার চলন-বলন, তার সাজের ধরন- সবকিছু নিয়েই নীরব চর্চা চলে কৌতূহলী মহলে। সেখানে সবার কাছ থেকে সেরা হওয়ার গণসমর্থন পাওয়া এক প্রকার কঠিনই বটে। তার পরও অনেক সময় ‘নতুন বউ’ হিসেবে ছাড় পায় কেউ কেউ। তো অধিনায়ক মুমিনুলের বোধহয় সেই ‘নতুন’-এর সময় পার হয়ে গেছে। নভেম্বর ২০১৯ থেকে ধরলে প্রায় আড়াই বছরের পুরোনো টেস্ট অধিনায়ক এখন মুমিনুল। তার মুখ দিয়ে বলা কোনো বক্তব্য এখন গুরুত্বের সঙ্গেই শিরোনামে আসে।

গতকাল তিনি ম্যাচ হারার পর ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন, তা কিন্তু নতুন বউয়ের কথা নয়, কয়েক বছর এই দল নিয়ে সংসার করার পরই তার উপলব্ধি হয়েছে- ‘এটা তো আগে থেকে সবাই জানেন যে, দু-একজন ছাড়া আমরা স্পিনে অতটা ভালো প্লেয়ার না। হয়তো শুনতে খারাপ লাগবে; কিন্তু আমার কাছে এটাই মনে হয়। স্পিন খেলি; কিন্তু কোন দিক দিয়ে খেলতে হবে, ওটা আমরা বুঝি না।’স্লেজিংয়ের অজুহাত, আম্পায়ারিংয়ের আক্ষেপ এবং দোষারোপের যে চেনা ছবি ডারবানে ‘অলআউট ৫৩’-এর পরপর দেখা গিয়েছিল, গতকাল পোর্ট এলিজাবেথে ‘অলআউট ৮০’-এর পর রাতারাতি তা উধাও। বরং মুমিনুলের সরল এই স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে তার অসহায়ত্বটা। তিনি নিজে এগারো বছর ধরে টেস্ট খেলে আসার পর এখন বুঝেছেন যে, দলে দু-একজন ছাড়া কেউ স্পিন খেলতে পারেন না!

ব্যাপারটি নিয়ে ফেসবুকে যা হয়ে থাকে, তাই হচ্ছে। হাসিঠাট্টা চলছে খুব। কিন্তু কোনো অধিনায়ক যখন বলেন তার দলের বাকি নয়জন স্পিন খেলতেই পারেন না, তখন কিন্তু সমস্যার গভীরতায় যাওয়া দরকার। টেস্টে একশর নিচে বাংলাদেশ অলআউট হয়েছে মোট ১৩ ইনিংসে। যার মধ্যে সবচেয়ে কম রানে অলআউট হওয়ার প্রথম চারটি ঘটনার দুটিই এই সিরিজে। এর আগে একশর নিচে ব্ল্যাকআউট হয়ে গেলে সেটাকে অঘটন বলা হতো।

এই যেমন ২০০৫ সালে কলম্বোতে যখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৮৬ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ, তারপর ২০০৭-এ এসে ফের সেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই ৬২ রানের অঘটন হয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৩। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আগের ওই ৬২ আর ৪৩ রানে অলআউট হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল প্রথম ইনিংসে। কিন্তু এবার দুটি বিশ্রী ইনিংসই এসেছে চতুর্থ ইনিংসে। পরপর দুটি বাজে ইনিংসের পর ব্যাপারটি যে গুরুতর, সেটাই বোধহয় বোঝাতে চেয়েছেন মুমিনুল।

তার কথামতো যদি ধরেই নেওয়া যায়, দু-একজন স্পিন খেলতে পারেন, সেই দু’জন কারা? মুশফিক- হয়তো তাকেই ইঙ্গিত করেছেন মুমিনুল। নিজের প্রতিও আস্থা রয়েছে মুমিনুলের। যদিও অধিনায়কের নিজেরই খেলার ধরনে দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। গত ১২টি টেস্ট ইনিংসের মধ্যে দুই অঙ্কের স্কোর করতে পেরেছেন মাত্র দুটিতে। তা ছাড়া আগের দিন মুশফিকের রিভার্স সুইপ নিয়ে চারদিকে যখন হইচই, তার মধ্যেই কিনা তিনি গতকাল উইকেট দিলেন সুইপ খেলতে গিয়ে। তার সঙ্গে ইয়াসিরও একই ভাবে আউট হলেন। লিটন আউট হলেন ডাউন দ্য উইকেটে এসে।

এসব যে ঝুঁকিপূর্ণ শট- এহেন গুরুকথা অন্য সবার চেয়ে তারা ভালো জানেন। তার পরও কেন ঝুঁকি নেন? এর উত্তর কোনো ক্রিকেটারকেই কখনও সোজাভাবে দিতে দেখা যায়নি। তবে অতীতে দেখা গেছে মানসম্পন্ন স্পিনে ঝুঁকি নিয়ে দু-একটি চার-ছক্কা মারতে পারলে বোলারের আত্মবিশ্বাস নড়িয়ে দেওয়া যায়- এটা একটা সস্তা পদ্ধতি। এ ধরনের টার্ন অ্যান্ড বাউন্সের সামনে ডিফেন্স করার কৌশলেও ঘাটতি থাকায় সেই সস্তা পদ্ধতিই বেছে নেন অনেকে। তাকে কোনোভাবে ফিফটি করতে পারলেই নতুনদের জন্য পরের ম্যাচ নিশ্চিত, আর অটো চয়েজদের জন্য ক্যারিয়ারের খাতায় কিছু রান যোগের তৃপ্তি।

তাহলে মুমিনুলের মতে, তার দলের অনেকেই স্পিন খেলতে পারেন না। বিদেশের মাটিতে বুকসমান বাউন্সের পেসেও তার ব্যাটারদের দুর্বলতা প্রমাণিত। তাহলে তারা পারেনটা কী? শুধু দেশের মাটিতে ডেকোরেটিং পিচ বানিয়ে হাঁটুর নিচে বল রেখে প্রতিপক্ষকে দুইশর মধ্যে আটকে ফেলা এবং ব্যাটারদের কেউ একজন দাঁড়িয়ে গিয়ে সেই রান তাড়া করা। এভাবে আর কতদিন। এই টেস্ট দলের যারা একাদশে খেলছেন তারা মধ্যে ক’জন ঘরের মাঠে শেষবার প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিলেন? ক’জনই বা নিজের মতো করে লাল বলে প্রশিক্ষণ করেন? শুধুমাত্র টেস্টের আগে দলের সঙ্গে হৈ হৈ করে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলে গা গরম করা এবং নেটে গিয়ে মিনিট পনেরো ব্যাটিং প্র্যাকটিস করলে কি টেস্টের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা যায়? জানা নেই।

Leave a Comment