তাওসিফের ঘটনায় আরেক স্পেশাল শিশুর বাবার আবেগঘন স্ট্যাটাস

 

রাজধানীর মালিবাগে তুচ্ছ কারণে বাবার সামনে মারধর করা হয় তাওসিফ আহনাফ নামে এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে। এ ঘটনায় অপরাপর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর অভিভাবকেরাও উদ্বিগ্ন।

ফেসবুকে লেখা এক পোস্টে এমন উদ্বেগের কথা জানিয়ে তামিম জামান নামে একজন পিতা এসব ‘বিশেষ শিশু’দের চিহ্নিত করতে তাদের পোশাকে বিশেষ কোনো চিহ্ন দেয়ার ব্যবস্থা করারও দাবি জানান প্রধানমন্ত্রীর কাছে। ফেসবুকে লেখা তার পোস্টটি এখানে তুলে ধরা হলো-

‘ছবিটা আমার আর আমার নাহিনের। সারাদিনের আলো ঝলমলে কোলাহল শেষে যখন ঘরে ফিরি… আলো আঁধারে ডুবে যায় আমাদের পৃথিবীটা। সে আঁধারে অশ্রুরা ভিড় করে, খিলখিলিয়ে হেসে উঠে জীবনের চাওয়া-পাওয়াগুলো। আপন মনে খেলা করে শুধু নাহিন নিজের পৃথিবীতে। ওখানে কোনো দুঃখ নেই। অভিযোগ নেই। অভিমান নেই। নেই কোনো চাওয়া-পাওয়া। নাহিনরা তাই কখনো খারাপ থাকে না। খারাপ থাকে শুধু আশেপাশের মানুষগুলো।

নাহিনকে নিয়ে পথ চলতে ভয় লাগে। আমরা আপন-পরের পার্থক্য বুঝি। কোনো পার্থক্য নেই শুধু নাহিনের কাছে। ও শুধু মানুষ বুঝে। পথ চলতে গেলে ছোঁ মেরে তাই পাশের মানুষটার হাত ধরে। মানুষটা চেনা না অচেনা বুঝে না সে। বুঝে না নারী বা পুরুষ। চিপ্‌স খুব প্রিয় নাহিনের। পথের ধারে এসব দেখলে ভোঁ দৌড় দেয়। কারো হাতে দেখলেও একই কাজ করে। না পারলে জেদ করে।

আশেপাশের মানুষ তাকায়। শিশুরা তাকায়। অবাক হয়। ভয় পায়। দূরে সরে যায়। কেউবা কৌতূহলভরে কাছে আসে। মজা পায়। আর কিছু করে কিনা, দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকে।

নাহিনদের সাধারণ শিশু থেকে আলাদা করা কঠিন। ওরা দেখতে হুবহু অন্য শিশুদের মতই। বুঝা যায় কেবল মাত্র আচরণে। বেশির ভাগ আচরণই মানুষের কাছে অচেনা। বাহিরে গেলে তাই নাহিনের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখি। ও যত অস্থির হয় হাতের বাঁধন ততো শক্ত হয়।

ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে নাহিন। মনকে পিছনে ফেলে প্রতিদিনই বড় হচ্ছে ওর দেহটা। এখন জেদ করলে হাতের কব্জিতে অনেক শক্তি নেমে আসে। সামলান কঠিন হয়ে পরে। ভয় হয়। তাওসিফের মতো সেও যদি কোনো মেয়ের সাথে বাচ্চাসুলভ আচরণ করে বসে! ও যদি দোষী হয়! কিছু বুঝার আগে যদি ওর গায়ে আঘাত নেমে আসে! ওর সব আঘাত যে আমার কলিজায় লাগবে। জনে জনে কি বলা যায় সরেন সরেন বেহেশতী শিশু আসছে।

প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে চাইবার কিছু নাই। শুধু একটাই চাওয়া অটিজম আক্রান্ত শিশুদের একটি কোনো চিহ্ন পোশাকে বহন করার সিস্টেম করে দিন। এই চিহ্নটাকেই আমরা ওর দেহে লাগিয়ে দিব। এই চিহ্নটাকেই আমরা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিব। দেখামাত্রই যাতে বুঝতে পারে ওরা ‘বিশেষ শিশু’। তাওসিফকে যারা আঘাত করেছে তাদের প্রত্যেককে জবাবদিহি করতে হবে। এতোগুলো মানুষের অন্তরের রক্তক্ষরণ বৃথা যেতে পারে না।’

প্রসঙ্গত, গত ২৯ মার্চ রাজধানীর মালিবাগে তুচ্ছ কারণে বাবার সামনে মারধর করা হয় তাওসিফ আহনাফ নামে এক ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ শিশুকে। তাওসিফ রাজধানীর কল্যাণী ইনক্লুসিভ স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ছে। তার বয়স ১৬ বছর হলেও তার আইকিউ ছয় বছরের।

শনিবার (২ এপ্রিল) বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে তাওসিফকে মারধরের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেন আরেকজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মা আঞ্জুম হোসেন। ব্যতিক্রমী এ মানববন্ধনে আঞ্জুম হোসেন তার আট বছরের মেয়ে জুওয়াইরিআহ এবং ছয় বছরের মেয়ে মুনিবাকে নিয়ে এসেছিলেন। ছোট্ট দুই শিশুর হাতেও ছিল প্ল্যাকার্ড। একজনের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার ভাইয়া বিশেষ শিশু, ভুল করলে আমাকে মার। আমার ভাইকে নয়’। আরেকজনের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার ভাইয়াদের মেরো না। সরি বল।’

আর আঞ্জুম হোসেনের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার সন্তান ইভটিজার নয়। ভুল কিছু করলে আমায় মারুন, আমার সন্তানকে নয়’। ছোট্ট ছোট্ট সন্তানদের নিয়ে এক মায়ের এমন মানববন্ধন অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এ ঘটনায় রমনা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন তাওসিফের বাবা।

Leave a Comment