‘গোল্ডেন রাইস’ নিয়ে সরকারি দুই সংস্থার দীর্ঘ টানাপড়েন

7 / 100

দরিদ্র মানুষের ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত ‘গোল্ডেন রাইসে’র ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেড় যুগ ধরে গবেষণা করে উদ্ভাবন করা এই ধানের বিরুদ্ধে পরিবেশ কর্মী ও সুশীল সমাজ সরব। অন্যদিকে এ ধানের জৈব-নিরাপত্তা বিষয়ক অনুমোদনও সহসা মিলেছে না। এসব কারণে এই ধান দেশে আবাদ করা যাবে কি না তা নিয়ে ধান বিজ্ঞানীদের মনেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখন ব্রি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে কার্যক্রম। একে অপরকে দায়ী করছে।

দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
সাধারণত চালের রং সাদা। চালের রং হলদে সোনালি হওয়ায় এই ধানের জাতের নাম দেওয়া হয়েছে ‘গোল্ডেন রাইস’। এটি জেনেটিক্যালি মডিফাইড শস্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিআর-২৯ জাতের ধানের সঙ্গে ভুট্টার জিন মিলিয়ে এই গোল্ডেন রাইসের জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশে এই ধান নিয়ে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। এই কাজে সহায়তা করে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) এবং মার্কিন দাতব্য সংস্থা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।

এই চাল ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ। দরিদ্র মানুষের ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই এ চাল বাংলাদেশে বিস্তৃত করতে চায় দেশের ধান গবেষণায় কাজ করা প্রতিষ্ঠান ব্রি। সরকারি এই সংস্থাটি বলছে, ‘ব্রি-এর বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এই চাল নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে এটি মানব শরীর, পশুপাখি ও পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। ব্রি ধান ২৯ যতটুকু নিরাপদ, গোল্ডেন রাইসও ততটুকুই নিরাপদ। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই চাল পরীক্ষা করে বলেছে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। একই কথা বলেছে হেলথ কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের ফুড স্ট্যান্ডার্ডসের মতো প্রতিষ্ঠানও।’

কিন্তু শুরু থেকেই এ ধানের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আছে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন। উবিনীগ বলছে, এ ধরনের জিএম খাবার চালু করার মতো পরিবেশ এখনো বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। কারণ এ ধরনের একটি ফসল চালু করতে হলে পরিবেশের ওপর, অন্যান্য ফসলের ওপর যে প্রভাব পড়বে, তা যাচাই করে দেখা হয়নি। বাংলাদেশের মতো দেশে এ রকম ফসলের দরকারও নেই। কারণ অনেক খাবারে ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়, বরং সেসব খাবার খেতে উত্সাহ তৈরি করতে হবে।

সম্প্রতি ইরির একটি প্রতিনিধি দল কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে দেখা করে গোল্ডেন রাইসের অনুমোদনের বিষয়ে অনুরোধ করেন। তখন কৃষিমন্ত্রী তাদের জানান, দেশে গোল্ডেন রাইস রিলিজের বিষয়টি বর্তমানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন আছে। তবে দেশে গোল্ডেন রাইস রিলিজের বিষয়ে পরিবেশবাদী ও সুশীল সমাজের আপত্তি রয়েছে বলে তিনি তাদের জানান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশ কর্মীদের বাধাও ততটা কার্যকর হতো না যদি গোল্ডেন রাইসের জৈব-নিরাপত্তা (বায়োসেফটি) বিষয়ক অনুমোদন পাওয়া যেত। অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাগ্রহকেই দায়ী করছেন তারা।

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোট আট বছর এই ধান নিয়ে গবেষণা করে ব্রি। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০১৭ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে গোল্ডেন রাইসের জৈব-নিরাপত্তা (বায়োসেফটি) বিষয়ক অনুমোদনের জন্য আবেদন করে ব্রি। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সেই আবেদন পাঠানো হয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন জৈব নিরাপত্তা বিষয়ক জাতীয় কমিটির (এনসিবি) কাছে। এনসিবি ব্রি-এর আবেদনটি পর্যালোচনা (রিভিউ) বা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের জন্য পরিবেশ বিভাগের আওতাধীন বায়োসেফটি কোর কমিটির (বিসিসি) কাছে প্রেরণ করে। ২০১৮ থেকে শুরু করে ২০১৯ পর্যন্ত মোট তিন বার বৈঠক করে বায়োসেফটি কোর কমিটি। কিন্তু এরপর দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অনুমোদন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এর মধ্যে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি মন্ত্রণালয় থেকে ব্রি-এর কাছে ১১টি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ব্রির বিজ্ঞানীরা বলছেন, সময়মতো সেই ১১টি বিষয়ে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণসহ ব্যাখ্যা প্রদানও করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আরো জানান, এরও বেশ কয়েক মাস পর, ন্যাশনাল কমিটি অন বায়োসেফটির (এনসিবি) পক্ষ থেকে ব্রি-এর কাছে আরো তিনটি প্রশ্ন পাঠানো হয়। যেখানে জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশে ভিটামিন-এ পরিস্হিতি কেমন, গোল্ডেন রাইসের যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা উন্নত দেশে করা হয়েছে তার মধ্যে কোনোটি বাংলাদেশের কোনো ‘অ্যাক্রেডিটেড’ ল্যাবে করা হয়েছে কি না এবং গোল্ডেন রাইসে যে পরিমাণ বিটা-ক্যারোটিন আছে তা দিয়ে আসলেই কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে কি না।

Leave a Comment