এবার পদ্মা সেতু পাড়ি দেবে বিষখালীর ইলিশ

7 / 100

চলাচলের জন্য আগামী ২৫ জুন খুলে দেওয়া হচ্ছে পদ্মা সেতু। এ সংবাদে উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে বইছে আনন্দ। বেতাগীর সর্বস্তরের মানুষ আশা করছে, পদ্মা সেতু চালুর পর ব্যবসা-বণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বিশেষ করে এই বিষখালীর ইলিশ, এ জনপদের কৃষকদের তরমুজ, বাদাম ও সুপারি যাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

এতে ভীষণ খুশি জেলে, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বেতাগী থেকে ঢাকা যেতে আগে সময় লাগতো ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর লাগবে সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা।
জানা গেছে, বেতাগীর বিষখালী নদীর ইলিশ স্বাদে-গুণে অনন্য। এছাড়া বেতাগীর তরমুজ, বাদাম ও সুপারি দেশ-বিদেশে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছে। এতদিন এসব পণ্য নদীপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। এছাড়া ঢাকাসহ অন্যান্য জেলা থেকেও বেশিরভাগ পণ্য আসত এই নদীপথেই। ফেরিতে আটকে থাকা, পণ্য পচে যাওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। পদ্মা সেতু চালুর পর এসব সমস্যার অবসান ঘটবে। জেলে কমল দাশ ও লিটন হাওলাদার জানান, ইলিশের মৌসুমে মাছ পেলে বেশি দাম পাওয়া যায় না। স্থানীয় পাইকারি ও খুরচা বিক্রেতার কাছে কম দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এবার অল্প সময় এই মাছ ঢাকায় পৌঁছানো যাবে এবং ন্যায্য দাম মিলবে।

এখানকার জেলেদের দাবি, বিষখালী নদীর ইলিশের স্বাদ অন্য নদীর চেয়ে অনেকগুণে বেশি। সুনিল হাওলাদার নামের এক বিক্রেতা জানান, বিষখালীর ইলিশের মতো স্বাদ এবং বড় আকারের ইলিশ বাংলাদেশের কোথাও পাওয়া যায় না।

ঝোপখালী গ্রামের ইলিশ বিক্রেতা হাসিনা বেগম বলেন, সরকারি চাকরি করা এক স্যারে বাজারে আইসাই আমারে জিগায় বিষখালীর ইলিশ আছেনি। ওই স্যার আমারে কয়, দ্যাশের কত্ত জাগার ইলিশ খাইলাম, এই ইলিশের মতো কোনো ইলিশের স্বাদ নাই।

হাসিনা বেগমের কথার সত্যতাও মেলে তাৎক্ষণিক। সেখান থেকেই চারটি ইলিশ কিনেছেন একজন ক্রেতা। তিনি বেতাগীর একটি সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা। গত তিন বছর ধরে বিষখালী নদীর ইলিশ পেলেই কিনে নেন তিনি। বলেন, এই নদীর ইলিশের মতো সাইজ আর স্বাদ দেশের কোথাও নেই।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ বিষয়ক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, আসলে নদীভেদে ইলিশের তেমন কোনো পার্থক্য নেই। স্বাদের পার্থক্যটি হয় পরিবেশ ও খাদ্যের কারণে। মিঠা পানির পরিবেশ এবং খাদ্যের মান ভালো থাকায় বিষখালীর ইলিশ স্বাদে ভিন্ন।

বেতাগী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল গাবফার বলেন, গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ উপজেলায় ৪ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ২ হাজার মেট্রিকটনের বেশি দেশের অন্যান্য জেলায় বিক্রি করা হয়।

বেতাগীর কৃষি অফিস সূত্র জানা গেছে, এ উপজেলার ২০৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ, ২৩৪ হেক্টর জমিতে বাদাম এবং ৩৫০ হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ করা হয়। উপজেলার বিবিচিনি, দেশান্তরকাঠি, গড়িয়াবুনিয়া, পুটিয়াখালী, বাসন্ডা, হোসনাবাদ, মোকামিয়া, বুড়ামজুমদার, কাজিরাবাদ, চান্দখালী, সড়িষামুড়ি ও কুমড়াখালীতে এসব কৃষিপণ্য ব্যাপকভাবে চাষ হয়।

মোকামিয়া ইউনিয়নের রতন হাওলাদার জানান, গত কয়েক বছর ধরে বাদাম ও তরমুজের ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে। তবে শ্রমিকের বেতন ও খরচ মিটিয়ে বেশি একটা লাভবান হচ্ছেন না কৃষকরা। তবে পদ্মা সেতুর কারণে এখন এগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি করা হবে এবং ন্যায্য দামও পাওয়া যাবে।

বেতাগী পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব এবিএম গোলাম কবির বলেন, স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সড়কপথে যোগাযোগব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে। কৃষি ও মৎস্য ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সুহৃদ সালেহীন বলেন, বেতাগী থেকে আমরা অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছতে পারবো। মানুষের দীর্ঘদিনের একটি চাওয়া পূরণ হতে চলেছে। এর ফলে এই বিষখালীর সুস্বাদু ইলিশ ও কৃষিপণ্য সহজে ঢাকায় পৌঁছে যাবে। এ অঞ্চলে শিল্প-কলকারখানা বাড়বে। সব শ্রেণির মানুষের উপকার হবে।

Leave a Comment