আমি কিডনি দেব, আপনারা শুধু খরচটা দিন!

6 / 100

রিপনসহ তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন। মা, বাবা আর ছোটবোনকে নিয়ে বেশ সুখেই কাটছিল তাদের জীবন। তবে সেই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি তাদের। মাধ্যমিক পাস করতেই সম্মুখীন হতে হয় এক বড় ধাক্কার রিপনকে। তাদের ছেড়ে পরপারে চলে যান পরিবারের অভিভাবক তার বাবা। এরপর পরিবারে নেমে আসে আঁধার। এক সময় সব আঁধার কেটে পথচলা শুরু করে রিপন।

ছাত্র হিসেবে রিপন বেশ মেধাবী। এলাকাজুড়ে রয়েছে কৃতি ছাত্রের সুনাম। পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। বাবার ইচ্ছে ছিল একমাত্র ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। কিন্তু সেটি আর পূরণ হয়নি।

সব কষ্ট আর অবসাদ ভুলে স্বামী হারিয়েও ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্নের হাল ছাড়েননি রিপনের মা। ছেলে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশের মানুষ সেবা করবে এ আশায় ভর্তি করান বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ কিলিমিটার দূরে রাজশাহী কলেজে। ভিটেমাটি আর অল্প একটু আবাদি জমির আয়ে চলছিল তাদের তিন সদস্যদের সংসার।

পড়াশোনা শেষ করে যখন পরিবারের হাল ধরার কথা রিপনের। তখনি আবার নেমে আসে অন্ধকার। অসুস্থ হয়ে পড়ের রিপন। এ অসুস্থতা স্বাভাবিক নয়। কিডনিজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছে তার। বাবা হারা রিপনের পরিবারে নেমে আসে আরেক পরীক্ষা। নিজের যা অর্থ ছিল আর মানুষের সহযোগিতা নিয়ে ছেলেকে চিকিৎসা করিয়েছেন মা। উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভারতে। সেখানে নেয়ার পর সাময়িকভাবে সুস্থ হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। এখনও মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন রিপন।

ডাক্তার বলেছেন তার দুটো কিডনিই নষ্ট। কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সন্তানকে নিজের একটি কিডনি দিয়ে সুস্থ দেখতে চান মা। কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপন করতে যে অর্থের প্রয়োজন সেটিই ব্যবস্থা করতে পারছেন না অসহায় রিতা বেগম।

এতক্ষণ ঘটনার যে বর্ণনা পড়লেন সেটি ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার লেহেম্বা ইউনিয়নের পকম্বা গ্রামের মৃত খতিব উদ্দীন ছেলে রিপনের। বাড়ির পাশের স্কুল থেকে প্রাইমারি, রাণীশংকৈল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করেছে রিপন। বর্তমানে রাজশাহী কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত তিনি।

প্রতিবেশী রুবেল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, রিপন আমাদের গ্রামের একটি সম্পদ। সে অনেক ভদ্র ও অমায়িক একটি ছেলে। এতিম এই ছেলেটিকে কেউ কখনও খারাপ বলতে পারবে না। এক বছর আগে কিডনির সমস্যা হয় তার। আমরা সবাই সহযোগিতা করে চিকিৎসা করিয়েছি। এখন তার কিডনি পরিবর্তন না করলে তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। এতে অনেক টাকার দরকার। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে আমরা আমাদের রিপনকে বাঁচাতে পারব।

স্থানীয় শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, রিপন অনেক মেধাবী ছাত্র। সে একজন বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতি ছাত্র। তার কিডনি প্রতিস্থাপন করা খুবই জরুরি। তার মা কিডনি দিতে চেয়েছেন। এখন সেটি প্রতিস্থাপন করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। আসুন আমরা সবাই মেধাবি একটি সম্পদকে বাঁচাতে এগিয়ে আসি।

রিপনের মা রিতা বেগম বলেন, স্বামী হারিয়েছি আট বছর আগে। তখন থেকে অনেক কষ্ট করে সংসারটা চালিয়ে নিচ্ছি। এখন আমার সংসারের একমাত্র ছেলেটি অসুস্থ। যা ছিল সব কিছু শেষ করে তার চিকিৎসা করাচ্ছি। ডাক্তার বলেছে কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া তাকে বাঁচানো সম্ভবনা। এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য আমার নেই। আপনারা আমার শেষ সম্বল। আমার সন্তানকে বাঁচাতে আপনারা সহযোগিতা করুন। আমি আমার কিডনি দেব, আপনারা শুধু খরচটা দিন। আমার স্বামী নেই। এই ছেলেকে ঘিরেই আমার পৃথিবী। আমার পৃথিবীকে বাঁচান।

অসুস্থ রিপন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাবার ইচ্ছে আর মায়ের স্বপ্ন ছিল উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবো। সেই স্বপ্ন নিয়েই পড়াশোনা করছিলাম। নিজে স্বপ্ন বুনছিলাম বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের জন্য কিছু করব। হয়তো সেটি আর হবে না। সপ্তাহে দুদিন হাসপাতালে না গেলে শ্বা”সকষ্টের সমস্যা হয়। মনে হয় আর বেশিক্ষণ সময় নেই বেঁচে থাকার। আমি তবুও স্বপ্ন দেখি আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন। আমি একদিন দেশ ও জাতির জন্য কিছু করব ইনশাআল্লাহ।

লেহেম্বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কালাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পকম্বা গ্রামের রিপনের বিষয়টি অবগত আছি। আসলে কিডনি প্রতিস্থাপন অনেক ব্যয়বহুল। তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে এত খরচ করা সম্ভব না। যদি আমরা সকলে এগিয়ে আসি তবেই তাকে বাঁচানো সম্ভব।

Leave a Comment